বিশ্বখ্যাত ‘টাইটানিক’ সিনেমার অমর গান ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ দিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন কানাডিয়ান প্রখ্যাত পপ তারকা সেলিন ডিওন। দীর্ঘ সময় ধরে বিরল ও জটিল এক স্নায়বিক রোগের সঙ্গে কঠিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে বাধ্য হয়েই মঞ্চ থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। তবে সকল শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে অবশেষে এক দারুণ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কনসার্টে ফিরেছেন এই জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। প্রায় ছয় বছর দীর্ঘ বিরতির পর প্যারিসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি, যা উপস্থিত দর্শকদেরও গভীরভাবে নাড়া দেয়।
ইউরোপ মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় কনসার্ট ভেন্যু প্যারিস লা ডিফেন্স অ্যারেনায় সেলিন ডিওনের এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে ভক্তদের মাঝে ব্যাপক আনন্দ ও উন্মাদনা লক্ষ করা যায়। সেখানে উপস্থিত প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও অবিরাম করতালিতে পুরো কনসার্ট চত্বর মুখরিত হয়ে উঠেছিল। চমৎকার পরিবেশনা শেষে ভক্তদের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সমর্থন দেখে আপ্লুত হয়ে পড়েন এই শিল্পী এবং মঞ্চেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে জানান যে তিনি অতীতে যে কথা দিয়েছিলেন, আজ তা রক্ষা করতে পেরেছেন এবং সবার ভালোবাসার কারণেই তিনি আবার ফিরে আসতে পেরেছেন।
এর আগে ২০২২ সালে সেলিন ডিওনের শরীরে অত্যন্ত বিরল একটি স্নায়বিক রোগ ধরা পড়ে, যার নাম ‘স্টিফ পারসন সিন্ড্রোম’। এই জটিল রোগের কারণে মানুষের শরীরের পেশিগুলো ক্রমান্বয়ে শক্ত হয়ে যায় এবং প্রায়শই তীব্র খিঁচুনির মতো মারাত্মক শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এই শারীরিক অবস্থার ফলে তার সাধারণ জীবনযাত্রার পাশাপাশি সংগীতচর্চা ও গান গাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন যে রোগটি তার কণ্ঠনালী এবং পুরো শরীরের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে অনেক সময় তার কাছে মনে হতো কেউ যেন তার গলা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। স্বরযন্ত্রে তীব্র চাপের সৃষ্টি হওয়ায় তার পক্ষে উঁচু কিংবা নিচু সুরে গান পরিবেশন করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছিল। এমনকি এই রোগের ভয়াবহতার কারণে তার হাত ও পায়ের আঙুলগুলো পর্যন্ত শক্ত হয়ে যেত এবং একবার তার বুকের পাঁজরও ভেঙে গিয়েছিল। মূলত ২০২০ সালের পর থেকে তাকে আর কোনো বড় পরিসরের পূর্ণাঙ্গ কনসার্টে দেখা যায়নি, যদিও সম্প্রতি প্যারিস অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে গান গেয়েছিলেন।
প্যারিস শহরে সেলিন ডিওনের এই চমৎকার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে টানা ২৬টি কনসার্টের একটি দীর্ঘ আয়োজন শুরু হয়েছে, যা নতুন বছরের শুরু পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে। দীর্ঘ অসুস্থতা তার শরীরকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও গান এবং মঞ্চের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা একটুও কমাতে পারেনি। দীর্ঘ ছয় বছর পর প্যারিসের মঞ্চে তার এই জাঁকজমকপূর্ণ প্রত্যাবর্তন এবং দর্শকদের ভালোবাসার সাগরে সিক্ত হওয়া আবারও প্রমাণ করেছে যে কোনো শারীরিক প্রতিকূলতাই এই কিংবদন্তি শিল্পীর সুরের যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।