ব্যবসায়িক ঋণ এবং বিভিন্ন পক্ষের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করার জন্য আদালতে একটি আবেদন করেছিলেন মো মোশাররফ হোসেন ওরফে ওসমান গনি নামের এক অটোমেটিক রাইস মিল ব্যবসায়ী। তার এই আবেদনের ওপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সম্প্রতি ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের বিচারক মো শহীদুল ইসলাম তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করে রায় প্রদান করেছেন। সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্র থেকে জানা গেছে যে, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে ওই ব্যবসায়ীর বর্তমান মোট দেনার পরিমাণ প্রায় ২৫২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আদালত সূত্রে আরও জানা যায় যে, গত বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে দেউলিয়া বিষয়ক আইনের ১০ ধারায় সংশ্লিষ্ট আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন অভিযুক্ত চালকল ব্যবসায়ী। মামলায় মোট ২৬৭ জন ব্যক্তিকে বিবাদী করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রথম থেকে সপ্তম বিবাদী হিসেবে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন আদালত উভয়পক্ষের নথিপত্র পর্যালোচনা করেন এবং মামলার তিন জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
মামলার নথিপত্র এবং ব্যবসায়ীর দাবি অনুযায়ী, তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অংকের ঋণ এবং বিনিয়োগ সুবিধা নিয়ে প্রাথমিকভাবে তিনটি বড় অটোমেটিক রাইস মিল সফলভাবে পরিচালনা করে আসছিলেন। ব্যবসার একেবারে শুরুর দিকে তিনি নিয়মিতভাবেই ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক পাওনা পরিশোধ করতেন বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় একের পর এক নতুন অটোমেটিক রাইস মিল গড়ে ওঠার কারণে বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয় এবং সামগ্রিকভাবে চালের ব্যবসায় বড় ধরনের মন্দা দেখা দেয়। এর ফলে চাল উৎপাদনে যে পরিমাণ খরচ হচ্ছিল, বাজারে উৎপাদিত চাল বিক্রি করে তার চেয়ে অনেক কম আয় হচ্ছিল। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে অটোমেটিক রাইস মিল শিল্পে তীব্র আর্থিক সংকট তৈরি হয় এবং ব্যবসায়িক লোকসানের মুখে পড়ে তিনি ঋণ ও পাওনা টাকা পরিশোধ করার সক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। ব্যবসায়ীর এই চরম আর্থিক সংকটের কারণে পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে এর আগে গত বছর নওগাঁ জেলায় বেশ কয়েকজন পাওনাদার একত্রিত হয়ে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছিলেন।
এদিকে আদালতের এই রায়ের পর মামলার ৭২ জন বিবাদীর পক্ষে আইনি লড়াই চালানো আইনজীবী মো রুহুল আমিন গণমাধ্যমের কাছে রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মূল অভিযোগ হলো, আদালত কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত না করেই তাড়াহুড়ো করে এই দেউলিয়া ঘোষণার রায় প্রদান করেছেন এবং কোনো সংস্থাকে বিষয়টির গভีর তদন্তের দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন যে, এই বিচারিক রায়ের ফলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সাধারণ পাওনাদাররা অত্যন্ত বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। কারণ কাউকে দেউলিয়া ঘোষণা করার পর পাওনাদারদের বকেয়া অর্থ ফিরে পাওয়ার আইনি সুযোগ প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায় এবং কিছু ব্যবসায়ী এই আইনি মারপ্যাঁচের সুযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা করেন। ক্ষতিগ্রস্ত পাওনাদারদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেউলিয়া ঘোষণার এই রায়ের বিরুদ্ধে খুব শীঘ্রই উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে বলেও তিনি জোরালোভাবে জানিয়েছেন।
মামলার বিবরণে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওসমান গনি কেবল বড় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেই ঋণ নেননি, বরং ৮ থেকে ২৬৭ নম্বর বিবাদী পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তি এবং স্থানীয় প্রোপ্রাইটরশিপ প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছ থেকেও ব্যক্তিগতভাবে টাকা ধার নিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ বিবাদী তালিকার ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তার সুদীর্ঘকালের ব্যবসায়িক লেনদেন ও সুসম্পর্ক ছিল, যা মামলার নথিতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ওসমান গনি আদালতে দাখিল করা তার মূল আরজিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, পাওনাদারদের সমস্ত পাওনা পরিশোধ করার জন্য তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে পারস্পরিক সমঝোতা কিংবা অন্য কোনো কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ চেষ্টা সত্ত্বেও পাওনাদারদের দাবি মেটানোর মতো কোনো সুরাহা করতে না পেরে তিনি পুরোপুরি বাধ্য হয়েই নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ায় পাওনাদারদের অর্থপ্রাপ্তির আইনি পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও আইনি হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।